তারেক রহমান দেশে ফেরা | বিএনপির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

তারেক রহমান দেশে ফেরা: বিএনপির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

তারেক রহমান দেশে ফেরা

দেড় দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর অবশেষে দেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার তার এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই প্রত্যাবর্তনকে বিএনপির জন্য শুধু একজন নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং দলীয় রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।


🔍 তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ ও প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য

তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ভেতরে এক ধরনের উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। বিশেষ করে সম্প্রতি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে “দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত এককভাবে তার নিয়ন্ত্রণে নয়”—এমন মন্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

যদিও এই সিদ্ধান্তে কারা জড়িত বা কী কারণে তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত—সে বিষয়ে বিএনপি কিংবা তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি। তবে শেষ পর্যন্ত তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির জন্য অনেকটা ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর’ মতো।


🏛️ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা: জিয়া পরিবার থেকে তারেক রহমান

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি প্রথমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হয়। নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের পথ পেরিয়ে দলটি এখন তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানই বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হবেন—এটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ পেতে আমাদের নতুন আলো ওয়েব সাইট ভিজিট করুন……


🗳️ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তারেক রহমান

বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দেবেন। এই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো তিনি নিজেও সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।


👤 তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও উত্থান

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান।

ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের পরিবারসহ অনেক সামরিক কর্মকর্তার পরিবার বন্দি ছিলেন—তখন তারেক রহমান ও তার ভাই আরাফাত রহমানও বন্দিদশার অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান রাজপথে সক্রিয় হন এবং ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে যুক্ত হন।


🚩 ২০০১ সালের নির্বাচন ও ‘হাওয়া ভবন’ অধ্যায়

২০০১ সালের সংসদ নির্বাচন তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বড় টার্নিং পয়েন্ট। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, নির্বাচনের আগে ‘হাওয়া ভবন’ নির্বাচনী অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে তারেক রহমান প্রচারণা ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হাওয়া ভবন ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়।


⚖️ গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নির্বাসন

২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। বিএনপির অভিযোগ অনুযায়ী, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এই নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল খালেদা জিয়াকে দেশত্যাগে বাধ্য করা। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান লন্ডনে পাড়ি জমান।


🌍 লন্ডন থেকে দল পরিচালনা ও ঘুরে দাঁড়ানো

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন এবং লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা শুরু করেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে এক পর্যায়ে তার বক্তব্য প্রচার বন্ধ হলেও তিনি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ভার্চুয়ালি দলকে সংগঠিত করেন।

ঘটনাক্রমে তিনি তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে সক্ষম হন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


🤝 আবেগঘন প্রত্যাবর্তন ও নেতাদের সংবর্ধনা

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তারেক রহমানকে আলিঙ্গন ও করমর্দনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান বিএনপির শীর্ষ নেতারা। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।


🔚 উপসংহার

তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন দেখার বিষয়—তার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব বিএনপিকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে এবং তিনি দলীয় নেতা থেকে দেশের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন কি না।

জাতীয় রাজনীতি
Powered by
Scroll to Top