২৬শে জুলাই, ২০১৭ ইং
Breaking::

ফুটবলেও আছে মোস্তাফিজরা, তুলে আনবে কে!

gy

বল হাতে দৌড় শুরু করলেন মোস্তাফিজুর রহমান। সবাই নড়েচড়ে বসছেন—এবার বুঝি প্রতিপক্ষের একটি উইকেট পড়ে। চোখ সরে না কারোই। ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজনও উপভোগ করেন ক্রিকেটের ব্যাট-বলের লড়াই। আফসোস করতে ভোলেন না, ফুটবলেও একজন সাকিব, তামিম বা মোস্তাফিজ যদি থাকত!

ফুটবল, ক্রিকেট দুটোই ভিন্ন স্বাদের খেলা। একটির সঙ্গে আরেকটি তুলনীয় নয়। কিন্তু লড়াকু চরিত্র প্রয়োজন দুই খেলাতেই। ক্রিকেটে তা আছে, ফুটবলে একেবারেই নেই। তাই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল দল ভুটানের কাছেও হারতে হয় আমাদের জাতীয় ফুটবল দলকে! তবে তৃণমূলে চোখ রাখলে একজন সাকিব, তামিম কিংবা মোস্তাফিজের ছায়া ঠিকই মিলবে। প্রতিভার আকাল ফুটবলে কোনোকালেই ছিল না। আগে পরিচর্যা ছিল, এখন নেই। পার্থক্য এই যা।

অথচ গত বছর এই সময়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের মালা পরেছে বাংলাদেশ। কিশোরদের গতি আর ছন্দময় ফুটবল মুগ্ধ করেছিল সবাইকে। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘এই ছেলেদের দায়িত্ব নিলাম। ওদের গড়ে তুলব ভবিষ্যতের জন্য।’

কিন্তু অভাগা ছেলেরা বাফুফের প্রশিক্ষণ দূরে থাক, কর্তাদের সামান্য একটু দর্শনও আর পায়নি। সাভার বিকেএসপির ১০ ছাত্র তাদের শিক্ষালয়ে চলে গেল। টুর্নামেন্টে দারুণ নৈপুণ্য দেখানো সারোয়ার জামান নিপুকে নিল প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন শেখ জামাল, সাদ ও সজীবকে ঢাকা আবাহনী। অধিনায়ক শাওন ব্রাদার্সে। বাকিরা ছড়িয়ে পড়ল এদিক-ওদিক। তারা এখন কোথায়, কেউ জানে না!

ভাগ্য ভালো নিপুর, চোট থাকায় তাকে নিতেই চাইছিল না শেখ জামাল। তখন দলটির কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক কর্তাদের সঙ্গে জোরাজুরি করে দলে রাখেন সম্ভাবনাময় ছেলেটিকে। পরিচর্যার পর এখন তো উপকৃত হচ্ছে ক্লাবই। বাংলাদেশের ক্লাবগুলো নিজের এই লাভটাই ঠিকমতো বুঝতে অক্ষম। প্রতিভা পরিচর্যা করলে ফলটা তো ক্লাবেরই। এমন প্রতিভা আরও আছে। চট্টগ্রাম আবাহনীতে খেলা কক্সবাজারের ইব্রাহিম, গাইবান্ধার রুবেল মিয়াও বেশ ভালো করছেন। তার মানে প্রতিভা আছে, দরকার শুধু একটু যত্ন নেওয়া।

সেই যত্ন নিতে দরকার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা একাডেমি। কিন্তু এই আবশ্যকীয় উপাদানটি বাংলাদেশে ফুটবলে কোনো দিনই গড়ে ওঠেনি। কর্তাদের মধ্যে পরিশ্রমবিমুখতা দেখে বিরক্তি প্রকাশ করে গেছেন এ দেশে আসা সব বিদেশি কোচই। ২০০৩ সালে সাফ জয়ের কারিগর অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটান সব সময়ই রসিকতা করতেন পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে, ‘তোমাদের কর্মকর্তাদের আমি খেলোয়াড় তুলে আনার পরিকল্পনা দিলাম। কিন্তু তাঁরা কাগজটা ড্রয়ারে রেখে তালা মেরে দিলেন! ড্রয়ার খুলে আর দেখেন না ওতে কী লেখা আছে।’

এ দেশের জল–হাওয়া গায়ে মাখাতে বারবারই ফিরে ফিরে এসেছেন কোটান। বর্তমানে আবাহনীর কোচের দায়িত্বে থাকা কোটান আজও পেছনে তাকিয়ে মজা করেন, ‘তোমাদের কর্তারা পারেন শুধু একটা কাজ করতে। পায়ের ওপর পা তুলে সাজানো রুমে বসে পিয়নকে ডেকে শুধু বলতে, ‘‘এই চা নিয়ে আয়, কফি নিয়ে আয়!” এটা আমি বাংলাদেশ দলের কোচ থাকার সময়ও কাছ থেকে দেখেছি!’

সময় এগিয়েছে। এটা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। থ্রিজি, ফোরজি কোনো ব্যাপার না। ঘরে বসেই করে ফেলা যায় সব কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলকর্তারা যেন পড়ে আছেন সেই আদি যুগেই। তাঁদের মানসিকতায় এতটুকু পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। ষাট-সত্তরের দশকে তাঁরা যেভাবে ফুটবল চালিয়েছেন, একবিংশ শতকে এসেও ঠিক সেভাবেই চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিভাবান অনূর্ধ্ব-১৬ দলের ছেলেদের দুই বছর তাঁরা একসঙ্গে রাখলেন না স্রেফ নিজেদের উদাসীনতায়। ওই ছেলেরা ছড়িয়ে পড়ল যার যার মতো করে। জাতীয় দল নতুন খেলোয়াড় তাহলে কোথায় পাবে? খেলোয়াড় তো আর আকাশ থেকে পড়বে না!

কথাটা কদিন আগে ফেসবুকের মাধ্যমে বলছিলেন এডসন সিলভা ডিডো, বাংলাদেশের সাবেক কোচ। এই ব্রাজিলিয়ান কোচ থাকার সময় অনেক নতুন খেলোয়াড় গড়ে তোলেন। কিন্তু প্রাপ্য স্বাধীনতা চাওয়ায় তাঁকে বিদায় দিতে দেরি করেনি করিতকর্মা ফেডারেশন! বিদায়ের সময় ডিডো গুলশানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাফুফে কর্মকর্তাদের এমনভাবে গালাগাল করছিলেন, যা ছাপার অযোগ্য।

এই ফেডারেশন মোস্তাফিজের উঠে আসা দেখেও নড়েচড়ে বসে না। অনুসরণ করে না সেই প্রবাদটা, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন!’ ভুটান–লজ্জার পর এই অভিযোগই আসছে ঘুরে-ফিরে। কর্তাদের বোঝা উচিত, সাকিব-তামিমদের মতো সম্পদ ফুটবলেও আছে। যেমন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সারা দেশে প্রতিভা অন্বেষণ করছে এখন, সেখানে কোচেরা উপজেলা পর্যায়ে ঘুরে জানাচ্ছেন, সারা দেশেই নাকি ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে অনেক মেধাবী কিশোর। এদের মধ্য থেকে অনেকেই ভবিষ্যতে বড় ফুটবলার হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এরা উঠে আসার সিঁড়িটাই সামনে পায় না।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বাফুফের কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানী বলছিলেন, ‘এত এত প্রতিভা দেখে আমরা মুগ্ধ।’ তবে অভিজ্ঞতা বলছে, কোচিং, অর্থ, খাওয়া–পরার ভাবনার বাস্তবতাতেই এরা হারিয়ে যায় অকালেই।’

বাংলাদেশে সমস্যা হলো, ধারাবাহিকতার বালাই নেই। অনূর্ধ্ব-১২, ১৩, ১৪ পর্যায়ে ফেডারেশন মাঝে মাঝে কিছু কাজ করেছে। তা হয়তো কোনো প্রতিযোগিতা সামনে রেখেই। কিন্তু প্রতিযোগিতার পর আর সেই খেলোয়াড়দের খোঁজ রাখেনি ফেডারেশন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এই কর্মসূচিও হয়তো একই পরিণতি দেখবে। কর্তারা সুরম্য ভবনে ঠান্ডা বাতাস উপভোগই করে গেলেন। অঙ্কুরেই যে বীজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই!

নেপাল, ভুটানের মতো দেশও একাডেমি গড়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনছে। বাংলাদেশ তা করছে না। তাই জাতীয় দল আজ মেধাশূন্য। ক্লাবগুলোও নির্বিকার। অথচ প্রতিটি ক্লাবের বয়সভিত্তিক দল থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই এটি আছে। এ ব্যাপারে ক্লাবগুলোর এগিয়ে আসার বিকল্প দেখছেন না জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আলফাজ আহমেদ। কিন্তু ক্লাব তৈরি পোশাক কেনার মতো ‘তৈরি খেলোয়াড়’ কিনে ১০–১৫ দিনের অনুশীলনে মাঠে নামে। নিচ থেকে খেলোয়াড় তুলে আনার ব্যাপারে তাদের যত অনীহা।

ক্লাবগুলো যখন নিজেদের আগ্রহে কিছু করতে নারাজ, বাফুফের উচিত ছিল, পেশাদার দলগুলোর সঙ্গে নবীনদের যুক্ত হতে সহায়তা করা। ঢাকার পাঁচটি ক্লাবকে বাফুফে যদি অনুরোধ করত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়ন দলের ২৫টি ছেলেকে দলে নিতে, নিশ্চয়ই তারা তা অগ্রাহ্য করত না। কিন্তু বাফুফে নির্বিকার, তাদের ইগো সমস্যা। অমুক ক্লাবকে অনুরোধ করব, ধেৎ, এটা হয় নাকি!

আশির দশকে দুজন নবীন খেলোয়াড়কে অন্তত তিন বছরের জন্য নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিল ফেডারেশন। সে সময় উঠে এসেছিলেন অনেক তারকা ফুটবলার। আজকের প্রতিষ্ঠিত কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘আমাকে তিন বছর বাইন্ডিংসে রাখে ব্রাদার্স ইউনিয়ন। তিন বছরের মাথায় আমি আগাখান গোল্ড কাপ খেলেছি।’ এভাবেই নব্বইয়ের দশকে উঠে আসেন জাকির হোসেন, রকিব হোসেন, ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব কিংবা জুয়েল রানা, মাসুদ রানারা। আজ সেই বাইন্ডিংস-প্রথা আবার চালু করার কথা বলেন অনেকেই। কিন্তু ক্লাব-ফেডারেশন সবাই বালুতে মুখ গুঁজে আছে।

ভুটান ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর সব হারিয়ে আবার সরব বাফুফে সভাপতি। বলছেন, এবার যুব কর্মসূচিতে হাত দেবেন। আট বছর ফুটবলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর নবম বছরে এসে তিনি বলছেন যুব কর্মসূচির কথা। তবে ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার!’ দেখা যাক, বাফুফে সভাপতি সত্যি সত্যিই এবার খেলোয়াড় তৈরিতে মনোযোগ দেন কি না!