২৬শে জুলাই, ২০১৭ ইং
Breaking::

গানের অনন্য জাদুকর

untitled

বেশ কিছুদিন ধরে মার্কিন ওয়েবসাইটগুলোতে অনবরত চলছিল একই জপ। নোবেল কমিটি পেয়েছেটা কী? সেই যে টনি মরিসন সাহিত্যে নোবেল পেলেন ১৯৯৩ সালে, এর পর দেখি যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ্যে আর শিকেই ছিঁড়ছে না!

মাঝখানের এই ২৩ বছরে অজানা অচেনা যেসব লেখক এ পুরস্কার পেলেন, তাঁদের কাকে মনে রেখেছেন পাঠকেরা? কিন্তু সব জল্পনা ছাপিয়ে এ বছরের সাহিত্যের নোবেলটা যুক্তরাষ্ট্রেই গেল। আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তো নয়, সারা পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে সেটি পেয়ে গেলেন বব ডিলান। সেই বব ডিলান, যিনি কিনা পপ সংস্কৃতির আইকন, অস্থির ও অশান্ত জীবনচর্চার এক গুরু। বিশুদ্ধ অর্থে সাহিত্যও করেননি। কেবল গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন আর গেয়েছেন।

আক্ষরিক অর্থে সাহিত্য করেননি, তেমন কেউ যে এর আগে কখনোই নোবেল পাননি, তা তো নয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৫৩ সালে নোবেল পেয়েছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক ও আত্মজৈবনিক রচনার পাশাপাশি ‘অসামান্য বাগ্মিতায় মানবীয় মূল্যবোধ’ তুলে ধরার জন্য। তাঁরও আগে পেয়েছিলেন আরও দুই বিশুদ্ধ দার্শনিক-সৃজনশীল নন, মননশীল অবদানের জন্য ১৯২৭ সালে ফ্রান্সের অঁরি বের্গসোঁ আর ১৯৫০ যুক্তরাজ্যের বাট্রা৴ন্ড রাসেল। কিন্তু বব ডিলানের ক্ষেত্রে যেটা হলো, তা অভূতপূর্ব। সংস্কৃতির ‘অভিজাত’ বৃত্ত থেকে পুরস্কারটি ছিটকে চলে এল সাধারণ জনতার ধূলি-ময়লা মাখা সংস্কৃতির বলয়ে।

সাহিত্যের উচ্চতর কোনো আভিজাত্য নেই, সাহিত্যিক সাধারণ মানুষের চেয়ে এক ইঞ্চিও উঁচু কেউ নন—এসব হল্লাচিল্লা গত প্রায় দেড় শতকজুড়ে অনেক হচ্ছে। কবিরা পুরোনো তকমা ছিঁড়েছুড়ে ফেলেছেন মাটিতে। কথাসাহিত্যিকেরা নেমে এসেছেন হাঁটুসমান কাদায়। কিন্তু মধ্যযুগের জীর্ণ হয়ে যাওয়া আভিজাত্যের পোশাকটি নোবেল কমিটি ত্যাগ করেনি। বব ডিলান সেই অসাধ্যটি সাধন করালেন।

অসাধ্য সাধনকারী, এই হচ্ছে তাহলে বব ডিলানের পরিচয়। সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার ঝোঁক সব সময়ই ছিল বব ডিলানের মধ্যে। আর বব ডিলান বেড়েও উঠেছিলেন সেই সময়টিতে, ১৯৬০-এর দশকে—চেনাজানা সব সীমানা ভেঙে ফেলার জন্য যখন দেশে দেশে হাতুড়ি আর কুঠার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তরুণেরা। তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুরকম মুক্তিরই দাবি নিয়ে—ব্যক্তির, জনতার। নিউইয়র্কে অ্যালেন গিন্সবার্গ আর তাঁর তরুণ বিট প্রজন্মের বন্ধুরা সামাজিক সব কানুন উড়িয়ে দিয়ে শুরু করলেন প্রকাশ্য খোলামেলা জীবনযাপন।

আরেক দিকে সমান তালে শুরু হলো মানবাধিকার আর যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন। বিশ্বজোড়া মানুষ জেগে উঠল বাম প্রগতিশীল প্রেরণায়। ম্যালকম এক্স বা মার্টিন লুথার কিংয়ের হাত ধরে কৃষ্ণাঙ্গ তরুণেরা পথে নামল বর্ণধর্ম-নির্বিশেষে মানুষের সম–অধিকারের স্বপ্ন নিয়ে। ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় যুদ্ধ বিশ্বপরিস্থিতি কড়াইয়ের মতো তপ্ত করে তুলেছিল। তারই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৮ সালে আগুন ছড়িয়ে পড়ল প্যারিসে, লন্ডনে, বার্লিনে ও রোমে। শহরের দেয়াল আর মানুষের মন ভরে উঠতে লাগল ছাত্রদের বারুদঠাসা স্লোগানে।

বব ডিলানের আবির্ভাব এই তপ্ত মঞ্চে, ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায়। এই সেই বব ডিলান, যিনি স্পর্ধাভরে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না ডুবে যাই, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি দাঁড়িয়ে থাকব মহাসাগরের ওপরে।’ আর তাঁর গানে তিনি মিলিয়েছিলেন তরুণদের এই দুই স্বপ্নকেই—তারুণ্যের অস্থির ও বন্ধনহীন আত্মপ্রকাশ, আর সব মানুষের অবাধ স্বাধীনতা।

একদিকে বব ডিলান ১৯৬০ সালে লিখছেন বিষণ্ন আর্তিতে বিধুর ‘ফেয়ারওয়েল, অ্যাঞ্জেলিনা’ গানটি, জোয়ান বায়েজের কণ্ঠে পরে যা অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায়। আবার ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’-এর বক্তৃতামঞ্চে গাইছেন ‘ব্লোয়িন ইন দ্য উইন্ড’। তাঁর গানে নিজেদের অন্তরাত্মার ছবি দেখতে পেল তরুণেরা। যে তরুণ অনিশ্চিত, যে তরুণ স্বপ্নচারী, যে তরুণ প্রতিবাদী। তাদের মধ্যে দাবানলের মতো আগুন ধরিয়ে দিলেন তিনি।

বব ডিলান হাজির হয়েছিলেন ফোক সং নিয়ে। হাতে গিটার আর মুখে হারমোনিকা, এই হয়ে উঠেছিল তাঁর চেনা প্রতিচ্ছবি। হারমোনিকাকে তিনি ফ্যাশনেবল করে তুললেন। তবে উডি গুথারি আর পিট সিগারের হাত ধরে ফোক সং তাঁর আগেই মার্কিন জনসমাজে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু তখনো তার ভোক্তা শিক্ষিত ও রুচিশীল মধ্যবিত্ত। বব ডিলান একে এনে ফেললেন মার্কিন জনসমাজে।

বব ডিলানের গান জনপ্রিয় হলো কিন্তু মোটেই তাঁর আত্মা হারাল না। তাঁর গানে কথার জাদুই প্রবল। প্রায় খোনা গলা ও নাকি স্বরের এমন গায়কের পক্ষে যে পৃথিবী জয় করা সম্ভব, কে এটা ভাবতে পারত? তা যে ঘটল, এরও এক শক্তি তাঁর গানের কথা। এক অসামান্য জাদুতে তাঁর গানে শিল্পিতা, ভাবুকতা আর অন্তরঙ্গতা একাকার হয়ে রইল। ‘ব্লোয়িন ইন দ্য উইন্ড’, ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’, ‘সাবটেরানিয়ান হোমসিক ব্লুজ’, ‘দ্য ট্যাম্বুরিন ম্যান’, ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’, ‘নকিং অন হেভেনস ডুয়োর’-এর মতো গানের মহিমা শেষ হওয়ার মতো নয়।

এক অনিকেত অস্থিরতা বব ডিলানেরও ছিল। আর তা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর পরিবারেরই ইতিহাস থেকে। ১৯০৫ সালের রাশিয়ায় ইহুদি-নিপীড়নের পটে তাঁর ইহুদি দাদা-দাদি ইউক্রেনের ওদেসা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। মঞ্চে গাইতে অভ্যস্ত ছিলেন না মোটেই। প্রথম জীবনের আকস্মিক খ্যাতিতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬৬ সালে এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ছুতোয় লোকচক্ষুর আড়ালে ডুব দিয়েছিলেন প্রায় আট বছর। মঞ্চে যিনি তাঁকে আবার ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনেন এবং অভ্যস্ত করে তোলেন—তিনি আরেক অসামান্য শিল্পী, ডিলানের এক সময়ের বান্ধবী জোয়ান বায়েজ।

এর পর সেই যে বব ডিলান ফিরে এলেন, বাকিটা তাঁর একের পর এক সীমানা জয়ের ইতিহাস। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি হয়ে ওঠা ছাড়া আমার পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব নয়, সেই আমিটা যা-ই হোক না কেন।’ গত পাঁচটি দশকে বব ডিলানের সেই আমি গানে গানে আমাদের অনেকের আমির সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। মহৎ শিল্পীর তো এটাই ধর্ম।