২৬শে জুলাই, ২০১৭ ইং
Breaking::

আনন্দযাত্রায় সঙ্গী যানজট

test

ঢাকার গুলিস্তান থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতু পর্যন্ত মাত্র ২৬ কিলোমিটার পথ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এটুকু পথ যেতেই ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের সময় লেগেছে প্রায় ছয় ঘণ্টা। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক তানিয়া আফরোজ বলেন, গুলিস্তান থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত যেতেই তাঁর সময় লেগেছে তিন ঘণ্টা।
যানজটে এই মহাসড়কের মদনপুরে আটকে পড়া ঢাকা থেকে ফেনীগামী ড্রিমলাইন বাসের সুপারভাইজার নিজামউদ্দিন গতকাল বেলা দুইটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, সকাল ১০টায় ঢাকা ছেড়েছেন। এখনো নারায়ণগঞ্জই পার হতে পারলেন না। ফেনী পৌঁছতে তাঁর সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-ফেনী তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গতকাল দিনের বিভিন্ন সময় ১৫-২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত রাতে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথে যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। ওই রাতে সেই ৫৫ কিলোমিটার পথ পার হতে বাস-ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহনের সময় লাগে প্রায় নয় ঘণ্টা। এই মহাসড়কের চন্দ্রাসহ কয়েকটি স্থান যানজটের স্থায়ী কারণ হয়ে আছে।
সড়কপথে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়ার জন্য পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি পারাপার এখনো প্রায় অপরিহার্য। কিন্তু পদ্মার ওপারে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এখন স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পদ্মার তীব্র স্রোত ও ভাঙনে সেখানকার চারটি ঘাটের মধ্যে দুটি (২ ও ৩ নম্বর) কয়েক দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে। ৪ নম্বর ঘাটটির অবস্থাও ভালো নয়। পাটুরিয়া থেকে ফেরি গিয়েও স্রোতের তীব্রতায় সেখানে ভিড়তে পারছে না। ওপার থেকে পাটুরিয়ায় যানবাহন আসতে পারছে আরও কম। ফলে ওপারে গতকাল দুপুরে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আর বিকেল থেকে যানজটের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে ঢাকা-পাটুরিয়া সড়কে। তবে গত রাতে চারটি ঘাট ফেরি পারাপারের জন্য সচল ছিল বলে জানা যায়।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সড়কপথের এই চিত্র সরেজমিনে দেখেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রীরা। গতকাল সকালে তাঁরা ঢাকা থেকে বের হন এই তিনটি পথে ঈদে ঘরমুখী মানুষের অবস্থা দেখতে। তাঁদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং মাঝে মাঝেই রাস্তায় বিকল হয়ে পড়া যানবাহন এ ধরনের অসহনীয় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। তা ছাড়া বৃষ্টির কারণে মহাসড়কগুলো কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। এর ফলেও যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিটি সড়কেই অসংখ্য পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশও কর্তব্যরত ছিলেন। ঈদ উপলক্ষে সড়কের শৃঙ্খলা ও যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার এই ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের তেমন কিছু করার ছিল না।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের আরও একটি কারণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ওই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হলেও এখানকার তিনটি সেতু কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী—দুই লেনই রয়েছে। ফলে চার লেন সড়ক দিয়ে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহন ওই সেতুগুলোর কাছে এসে থমকে যাচ্ছে। এর ফলে যানজটের তীব্রতা বাড়ছে। মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গিয়ে গতকাল চট্টগ্রাম সিটি গেট এলাকায় মন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য জাইকার সহায়তায় তিনটি নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘুরে দেখেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শরিফুল হাসান। তিনি জানান, এ সময় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাস, গরুবোঝাই ট্রাক, রপ্তানি পণ্যবোঝাই লরি থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি পর্যন্ত—সব যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা থমকে ছিল। এ সময় যাত্রীদের বেশির ভাগই বিরক্তি, হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গরুবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন চালক রাশেদুল ইসলাম। গতকাল বেলা দুইটায় তাঁর ট্রাকের অবস্থান ছিল নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে। রাশেদুল চরম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গত বুধবার রাত আটটার দিকে তিনি গাজীপুরের চন্দ্রা মোড় পার হন। তারপর এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছেন। কবে যে চট্টগ্রাম পৌঁছতে পারবেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
এই অবস্থার মধ্যেও অবশ্য কেউ কেউ আবার বাস-ট্রাক থেকে পথে নেমে হাঁটাহাঁটি করে সময় পার করেছেন। কেউ আবার গরুর ট্রাকের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলেছেন। কেউবা মগ্ন ছিলেন গভীর ঘুমে। তবে ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের মধ্যে নারী ও শিশুদের কষ্ট ছিল সবচেয়ে বেশি। ঢাকা থেকে কুমিল্লাগামী একটি বাসের যাত্রী আবদুল কাদের বলেন, এই রাস্তা তো অনেক প্রশস্ত করা হয়েছে। এই রাস্তায় যখন এমন অবস্থা, তখন অন্য এলাকার অবস্থা যে কী, কে জানে।
চার লেন এই মহাসড়কের ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার দৃশ্য যখন এই, তখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে আসার দুটি লেনের চিত্র ছিল একেবারেই উল্টো। প্রায় ফাঁকা সেই দুই লেন দিয়ে হাতে গোনা কিছু যানবাহন দ্রুতগতিতে ছুটছিল ঢাকার দিকে।
ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ-পাটুরিয়া হয়ে পদ্মার ওপারে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পর্যন্ত গতকাল সারা দিন ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কমল জোহা খান, সঙ্গে ছিলেন গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি রাশেদ রায়হান। গতকাল সকালের দিকে পাটুরিয়ায় যানবাহনে ভিড় ছিল না। কিন্তু পদ্মার ভাঙনের ফলে ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুপুর থেকে পাটুরিয়া ঘাটে যানজট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ততক্ষণে পদ্মার ওপারে দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কে যানজট প্রায় ছয় কিলোমিটারে পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পাটুরিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পাটুরিয়ার পাঁচটি ঘাটের সব কটি সচল রয়েছে। তবে ভাঙনের কবলে পড়ায় দৌলতদিয়ার চারটি ঘাটের ২ ও ৩ নম্বর ঘাট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য দুটি ঘাটের অবস্থাও যখন-তখন। এ কারণে যানবাহন ও যাত্রী পারাপারে জট সৃষ্টি হয়েছে।
গোয়ালন্দের বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ১৮টি ফেরি যানবাহন পারাপারের জন্য প্রস্তুত আছে। তবে ঘাট-সংকটের কারণে ফেরি চালানো যাচ্ছে না।
স্রোতের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে লঞ্চ চলাচলও কম হচ্ছে। কুষ্টিয়ার যাত্রী নজরুল ইসলাম জানান, নবীনগর থেকে বাসে পাটুরিয়া এসেছেন। লঞ্চে ওপারে যেতে চাইছেন। কিন্তু ঘাটে এসে লঞ্চের দেখা পাননি। তাই ফেরিতে পদ্মা পার হবেন।
গতকাল সারা দিন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আনোয়ার হোসেন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন গাজীপুর প্রতিনিধি মাসুদ রানা। ওই সড়কে উত্তরবঙ্গগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাসগুলো ছিল যাত্রীতে ঠাসা। ছাদেও তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। ভাদ্রের গরমে সব যাত্রী ছিলেন অস্থির। একপর্যায়ে সড়কের পাকুল্লা নামক স্থানে কয়েকজন যাত্রী বাসের ছাদ থেকে নেমে পাশের বিলের পানিতে ডুব দিয়ে আবার বাসের ছাদে অবস্থান নেন। তাঁদের ভিজা কাপড়চোপড় নিয়ে তখন অন্য যাত্রীরা মাথা ঢাকেন।
তাঁদের একজন আবদুল মালেক বলেন, বাস চললে বাতাসে গরম টের পাওয়া যায় না। কিন্তু যানজটে পড়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তাঁর সঙ্গী আরমান মিয়া বলেন, তাঁরা ভোর ছয়টায় গাবতলী সেতুর কাছ থেকে বাসে ওঠেন। চন্দ্রা মোড় পর্যন্ত ভালোই চলেছে। এরপর আর বাস এগোচ্ছে না।
এ সময় বিপরীত দিকে দেখা যায় ঢাকামুখী অনেকগুলো কোরবানির গরুবাহী ট্রাক। গরমে গরুগুলোর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। ব্যাপারীদের কেউ কেউ পশুগুলোর গায়-মাথায় পানি ছিটাচ্ছিলেন। কেউ আবার বাতাস করছেন হাতপাখা দিয়ে।
এই মহাসড়কের যাত্রী, চালক ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চন্দ্রা মোড় থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথই সাত-আট ঘণ্টা সময় খেয়ে ফেলছে। ঢাকার গাবতলী, মহাখালী টার্মিনালসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে সড়কপথে উত্তরবঙ্গের ২০টি জেলার যানবাহন চলে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, গাজীপুর বাইপাস ও আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক ধরে সব যানবাহন এসে মেশে চন্দ্রা মোড়ে।
হাইওয়ে পুলিশ বলছে, চন্দ্রার আগে অনেক বিকল্প পথ আছে। আবার বঙ্গবন্ধু সেতুর মুখে সড়ক চওড়া। ফলে মাঝখানের ৭০ কিলোমিটারে যানবাহনের চাপ পড়ে যায়। ঈদে তো চাপ আরও বাড়ে। এ ছাড়া গত রাতে গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে দুটি মালবাহী ট্রাক বিকল হয়ে যানজট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশ চন্দ্রা মোড় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ সিমেন্টের খুঁটিতে দড়ি বেঁধে আসা-যাওয়ার পথ আলাদা করে দিয়েছে। সকাল নয়টার পর থেকেই সেখানে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। সাড়ে নয়টার দিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এক কিলোমিটার যেতেই দেখা গেল, উভয় দিকের গাড়িই আটকে আছে। সেখান থেকে খাড়াজোড়া উড়ালসড়ক পর্যন্ত কোনো যানবাহন নড়ছে না। প্রায় এক ঘণ্টা পর গাড়ি কিছুটা চলতে শুরু করে।
কখনো হাঁটা গতিতে, কখনো এর চেয়ে বেশি গতিতে চলতে চলতে মির্জাপুর রেলক্রসিংয়ের কাছাকাছি গেলে সেখানেই আটকে যেতে হয়। তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা। সেখান থেকে ঢাকার পথেও তীব্র যানজট। চন্দ্রা মোড় থেকে পাকুল্লা যাওয়া-আসায় গাড়ির মিটারে উঠেছে ৫০ কিলোমিটার। সময় লেগেছে সাড়ে ছয় ঘণ্টা। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা বলেন, সন্ধ্যার পর যানবাহনের চাপ আরও বাড়বে। ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথের যানজটে বিপর্যয় নেমে এসেছে ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রায় এবং অগ্রিম টিকিট কেটে রাখা বাসের সময়সূচিতে।
এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপক আতিকুল আলম বলেন, মহাখালী থেকে ভোর ছয়টায় যে বাস ছেড়েছে, বিকেল সাড়ে চারটায় তা বগুড়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। রংপুর থেকে ফিরে এসে যাত্রী বহনের কথা বৃহস্পতিবার রাতে। একইভাবে রংপুর থেকে বুধবার ১১টায় রওনা করা বাস তখনো গাজীপুর বাইপাসে অবস্থান করছিল।
বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ৫ সেপ্টেম্বর সেতু দিয়ে যানবাহন চলেছে ১৬ হাজার ৮৮৭। পরদিন চলে ১৯ হাজার ৭২০। আর বুধবার চলেছে ২০ হাজার ৯০০। আগামী এক সপ্তাহে প্রতিদিনই তা বাড়বে। কারণ, ঈদ ঘিরে রাজধানীতে চলা বাস ও পুরোনো ট্রাকও রাস্তায় নেমে যায় প্রতিবছর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.